
শান্ত পাহান, ঠাকুরগাঁও:
গ্রামের প্রত্যন্ত পরিবেশ থেকে উঠে এসে দারিদ্র্য ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন জয়ন্তী মনি পাহান। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং শিখে নিজেকে একজন দক্ষ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। তাঁর স্বপ্ন—নিজের যোগ্যতায় আয় করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং একদিন দেশ ও দেশের বাইরের মানুষের সঙ্গে কাজ করা।
দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের বড়ভিটা গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকার আদিবাসী পরিবারের সন্তান জয়ন্তী মনি পাহান। বর্তমানে তিনি দিনাজপুর শহরে বসবাস করছেন এবং ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন ড্রিম টেক আইটি একাডেমির ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ও কাজের সঙ্গে।
জয়ন্তীর জীবনের গল্পের শুরু গ্রামের বাড়ি বড়ভিটা থেকে। ছোটবেলায় তাঁর মা-বাবা দুই মেয়েকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে দিনাজপুর শহরে চলে আসেন। সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তাঁদের এই সিদ্ধান্ত। এরপর দিনাজপুর শহরেই দুই বোনের শৈশব ও বেড়ে ওঠা। বর্তমানে জয়ন্তী ও তাঁর বড় বোন দুলালী পাহান মা-বাবার সঙ্গে শহরে থাকেন। আর তাঁদের বড় দাদা গ্রামের বাড়ি বড়ভিটায় বসবাস করেন।
শহরে এসে পড়াশোনার সুযোগ পেলেও পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা কখনো তাঁদের পিছু ছাড়েনি। সীমিত আয়ের সংসারে প্রতিদিনের জীবনযাপনই যেখানে সংগ্রামের, সেখানে ভবিষ্যতের জন্য বড় কোনো স্বপ্ন দেখা অনেকের কাছেই কঠিন। কিন্তু জয়ন্তী সেই বাস্তবতার মধ্যেই নিজের জন্য একটি নতুন পথ খুঁজে নিয়েছেন।
চাকরির পেছনে না ছুটে দক্ষতা অর্জনের সিদ্ধান্ত
জয়ন্তী মনে করেন, শুধু চাকরির আশায় বসে থাকলে তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব নাও হতে পারে। তাই নিজের দক্ষতা তৈরি করে অনলাইনে কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।
বড় বোন দুলালী পাহানের অনুপ্রেরণায় ২০২৫ সালে ড্রিম টেক আইটিতে যোগ দেন জয়ন্তী। সেখান থেকেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয় শেখার পাশাপাশি নিজেকে ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করছেন।
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে জয়ন্তী মনি পাহান বলেন,
“আমরা গরিব মানুষ। চাকরির পেছনে না ছুটে আমি আমার বড় বোন দুলালী পাহানের হাত ধরে ২০২৫ সালে ড্রিম টেক আইটিতে যোগদান করি। আমি চাই, আমি এই দেশের একজন ফ্রিল্যান্সার হয়ে দেশ ও দেশের বাইরের কাজ করে উপার্জন করতে। সেই উপার্জনের মাধ্যমে আমি আমার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাই।”
পরিবারের আর্থিক কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন,
“আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। একদিন কাজ না করলে আমাদের কপালে ভাত নেই। আমাদের এমন সামর্থ্যও নেই যে অনেক টাকা খরচ করে কোনো চাকরি করব। তাই আমি চাই নিজের দক্ষতা দিয়ে কাজ শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে।”
স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের ভবিষ্যৎ
জয়ন্তীর কাছে ফ্রিল্যান্সিং শুধু একটি পেশা নয়; এটি নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার একটি সম্ভাবনা। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি এমন একটি কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে চান, যেখানে নিজের সময় ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন।
তাঁর স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মা-বাবা। পরিবারের কষ্ট তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই ভবিষ্যতে নিজের উপার্জনের মাধ্যমে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চান। পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও দূর করে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
আদিবাসী তরুণীদের জন্যও হতে পারে অনুপ্রেরণা
জয়ন্তী মনি পাহানের এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বপ্ন নয়; এটি প্রত্যন্ত এলাকার অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য একটি বার্তাও বহন করে। সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তানরাও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন করে নিজের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারেন।
বিশেষ করে আদিবাসী পরিবারের মেয়েদের জন্য জয়ন্তীর এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে। প্রচলিত চাকরির পাশাপাশি বর্তমান ডিজিটাল যুগে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইনভিত্তিক কাজের মাধ্যমে আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্বপ্ন দেখছেন নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার
জয়ন্তী মনি পাহান এখনো তাঁর স্বপ্নের পথের শুরুতে। সামনে রয়েছে আরও শেখার সময়, আরও পরিশ্রম এবং নিজেকে দক্ষ করে তোলার সুযোগ। তবে তাঁর চোখে ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন, সেখানে রয়েছে আত্মনির্ভরতার দৃঢ় প্রত্যয়।
তিনি চান, একদিন তাঁর পরিচয় শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, বরং একজন দক্ষ ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও তৈরি হোক। দেশ ও দেশের বাইরের মানুষের কাজ করে নিজের যোগ্যতায় উপার্জন করবেন—এটাই তাঁর স্বপ্ন।
দারিদ্র্য হয়তো তাঁর পথকে কঠিন করেছে, কিন্তু স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। বড়ভিটা গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে দিনাজপুর শহরে এসে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের যে চেষ্টা জয়ন্তী মনি পাহান করছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
স্বপ্ন পূরণের এই পথচলায় জয়ন্তী মনি পাহানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ইচ্ছাশক্তি। আর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একদিন তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন—এমন প্রত্যাশাই তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি
Leave a Reply